২৩ হাজার ছবির ভিড়ে সেরা ছবির খোঁজ

প্রকাশ: বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
https://mail.techvoice24.com/assets/images/logoIcon/logo.png টেকভয়েস২৪ রিপোর্ট
https://mail.techvoice24.com/assets/images/logoIcon/logo.png
  ছবি: সংগৃহীত

একটি ছবি হয়তো দেখতে সুন্দর। কোনো ছবিতে ধরা পড়ে তীব্র আবেগ, কোনোটি আবার পরিচিত কোনো দৃশ্যকে দেখায় সম্পূর্ণ নতুন চোখে। আবার এমন ছবিও থাকে, যা দেখার পর ছবির গল্পটি দীর্ঘ সময় মনে থেকে যায়। কিন্তু ২৩ হাজারের বেশি ছবির মধ্য থেকে যখন মাত্র কয়েকটি ছবিকে সেরা হিসেবে বেছে নিতে হয়, তখন কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়?

‘অপো ফটোগ্রাফি কনটেস্ট ২০২৬’-এ বিচারকদের সামনে ঠিক এমনই কঠিন প্রশ্ন ছিল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো ছবির ভিড় থেকে সেরাটি খুঁজে নেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন চারজন স্বনামধন্য ফটোগ্রাফার ও ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলার। তাঁদের প্রত্যেকের দেখার ধরন আলাদা, অভিজ্ঞতাও ভিন্ন। ফলে প্রতিটি ছবিকে শুধু ক্যামেরার কারিগরি দক্ষতায় নয়, বরং তার ভেতরের গল্প, আবেগ ও দৃষ্টিভঙ্গির জায়গা থেকেও দেখা হয়েছে।

ছবির ভেতরের গল্পটাই বড়
বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস উদযাপনের অংশ হিসেবে ‘এভরি ফটো টেলস এ স্টোরি’ প্রতিপাদ্যে আয়োজন করা হয় এই প্রতিযোগিতা। তরুণ ফটোপ্রেমীদের স্মার্টফোন ক্যামেরায় নিজেদের চোখে দেখা পৃথিবীকে তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হয় এতে।

পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত অপো রেনো১৫ সিরিজ ফাইভজি প্রেজেন্টস ‘অপো ফটোগ্রাফি কনটেস্ট ২০২৬’-এ ছিল পাঁচটি বিভাগ-পোর্ট্রেট, নেচার অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ, স্ট্রিট অ্যান্ড আর্কিটেকচার, লো লাইট এবং হেরিটেজ অ্যান্ড কালচার। প্রতিটি বিভাগেই উঠে এসেছে বাংলাদেশের মানুষ, প্রকৃতি, নগরজীবন, ঐতিহ্য ও দৈনন্দিন জীবনের নানা গল্প।

 
হাজারো ছবির মধ্য থেকে সেরাটি বাছাই করতে গিয়ে বিচারকেরা শুধু ছবির আলো, ফ্রেম, কম্পোজিশন কিংবা কারিগরি নিখুঁততার দিকে তাকাননি। তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ছবিটি দর্শকের মনে কী অনুভূতি তৈরি করছে, ছবিটির দৃষ্টিভঙ্গি কতটা আলাদা এবং ছবিটি নিজের গল্প কতটা শক্তিশালীভাবে বলতে পারছে। অর্থাৎ, নিখুঁতভাবে তোলা একটি ছবি সব সময় সেরা ছবি নয়। কখনো একটি সাধারণ দৃশ্যও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে ফটোগ্রাফারের দেখার ধরন ও মুহূর্তটি ধরার ক্ষমতার কারণে।

সাধারণের মধ্যেই অসাধারণের সন্ধান
পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও ফটোগ্রাফি বিভাগের প্রধান খন্দকার তানভীর মুরাদের কাছে ফটোগ্রাফির মূল সৌন্দর্যই হলো সাধারণের মধ্যে অসাধারণ কিছু খুঁজে পাওয়া।

তিনি বলেন, “সাধারণ মুহূর্তের মাঝে অসাধারণ কিছু আবিষ্কার করার নামই ফটোগ্রাফি, আর অপো সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব রূপ দিতে সহায়তা করে।”

তাঁর কথায়, একটি সৃজনশীল দৃষ্টিকোণ সাধারণ কোনো দৃশ্যকেও অসাধারণ করে তুলতে পারে। তাই ক্যামেরা চালানোর কারিগরি জ্ঞানের পাশাপাশি একজন ফটোগ্রাফারের নিজস্ব চোখ বা দেখার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ছবির পেছনে থাকা আবেগ
অ্যাসিড সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত কাজসহ ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফিতে কাজ করছেন শফিকুল আলম কিরণ। তাঁর কাছে একটি শক্তিশালী ছবির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বার্তা।

তিনি বলেন, “অপোর সাথে ফটোগ্রাফি কেবল বিশেষ কোনো মুহূর্তকে ফ্রেমে বন্দি করা নয়; বরং সেই মুহূর্তের পেছনের আবেগময় স্মৃতিকে ধরে রাখা।”

স্মার্টফোনকে বর্তমান সময়ের ফটোগ্রাফারদের জন্য ‘থার্ড আই’ হিসেবে দেখেন তিনি। তাঁর মতে, সহজলভ্য এই প্রযুক্তি তরুণদের নিজেদের চোখে পৃথিবীকে দেখার এবং সেই দেখাকে অন্যদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ করে দিয়েছে। প্রতিযোগিতায় জমা পড়া ছবির বৈচিত্র্যও বাংলাদেশের তরুণ ফটোগ্রাফারদের বাড়তে থাকা সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাসের প্রমাণ বলে মনে করেন তিনি।

সেরাদের বাছাইয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত
অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার ও ফটোজার্নালিস্ট কে এম আসাদের কাছেও ২৩ হাজারের বেশি ছবির মধ্য থেকে সেরাদের বেছে নেওয়া সহজ ছিল না। কারণ, প্রতিযোগিতায় জমা পড়া ছবিগুলোর অনেকগুলোই ছিল মানসম্মত।

মানবিক, পরিবেশগত ও সামাজিক নানা বিষয় ডকুমেন্ট করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ছবিগুলো দেখেছেন। তাঁর মূল্যায়নে একটি ছবির বিষয়, দৃষ্টিভঙ্গি, কারিগরি দক্ষতা এবং গল্প বলার ক্ষমতা-সবকিছুর সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, “অপো ছবি তোলার একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করার মাধ্যমে প্রতিদিনের মুহূর্তগুলোকে স্মরণীয় গল্পে পরিণত করে।”

দর্শককে থামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা
বিচারকদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল-কোন ছবির সামনে একজন দর্শক থমকে দাঁড়াবেন? কোন ছবি তাঁকে আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করবে? আর কোন ছবির গল্পের সঙ্গে নিজের কোনো অনুভূতি বা অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পাবেন?

পাঁচটি বিভাগে জমা পড়া ছবিগুলোর মধ্যে কারিগরি দিক থেকে নিখুঁত ছবি খুঁজে পাওয়া তাই একমাত্র লক্ষ্য ছিল না। বরং এমন ছবি খোঁজা হয়েছে, যা প্রথম দেখাতেই মনোযোগ কাড়বে এবং দেখার পরও দর্শকের মনে কোনো অনুভূতি বা প্রশ্ন রেখে যাবে।

একই পৃথিবী, ভিন্ন চোখ
রাজোয়ানা চৌধুরী জিনিয়ার মতে, প্রতিযোগিতার বিভিন্ন বিভাগ ফটোগ্রাফির সবচেয়ে শক্তিশালী একটি বৈশিষ্ট্যকে সামনে এনেছে—একই পৃথিবীকে ভিন্ন ভিন্ন চোখে দেখা।

তিনি বলেন, “পৃথিবীকে আমরা কীভাবে দেখি তা তুলে ধরার মাধ্যমে ফটোগ্রাফির সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। আর এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে অপো আমাদের প্রয়োজনীয় টুল দেয়।”

পোর্ট্রেট থেকে রাস্তার পরিবর্তনশীল মুহূর্ত, ওয়াইল্ডলাইফ থেকে ঐতিহ্য, স্থাপত্য থেকে চ্যালেঞ্জিং লো-লাইট দৃশ্য—প্রতিটি বিভাগেই দেখা গেছে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। একই বিষয়ও আলাদা ফটোগ্রাফারের ক্যামেরায় পেয়েছে আলাদা গল্প ও আলাদা ভাষা।

 
চার বিচারকের অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়নকে একসঙ্গে রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট-‘পারফেক্ট’ ছবি তোলার কোনো নির্দিষ্ট সূত্র নেই। কোনো ছবি হয়তো আবেগ দিয়ে জয় করে নেয়, কোনোটি নতুনত্ব দিয়ে। আবার কোনো ছবি খুব সাধারণ একটি মুহূর্তকে এমনভাবে তুলে ধরে, যা আগে সেভাবে চোখে পড়েনি। শেষ পর্যন্ত সেরা ছবি হলো সেটিই, যা শুধু চোখে ভালো লাগে না; বরং মনে কোনো ছাপ রেখে যায়।

২৩ হাজার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য থেকে একটি গল্প
২৩ হাজারের বেশি ছবির প্রতিটিই ছিল একজন ফটোগ্রাফারের নিজের পৃথিবীকে দেখার একটি আলাদা জানালা। সেই হাজারো দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য থেকে চার বিচারকের অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়নের সমন্বয়ে খুঁজে নেওয়া হয়েছে এমন কিছু ছবি, যেগুলো শুধু একটি মুহূর্তকে ধারণ করেনি, বরং সেই মুহূর্তের সঙ্গে একটি গল্পও বহন করেছে।

আর এখানেই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত সাফল্য-একটি ছবি শুধু ফ্রেমে আটকে থাকবে না, বরং দর্শকের মনে থেকে যাবে।

প্রতিভার স্বীকৃতির পাশাপাশি শেখার সুযোগ
ফটোগ্রাফিক প্রতিভা খুঁজে বের করার পাশাপাশি উদীয়মান ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলারদের আরও এগিয়ে নেওয়াও ছিল এই আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য। প্রতিযোগিতার গ্র্যান্ড উইনার পেয়েছেন ১ লাখ টাকা, একটি অপো ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন এবং পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটের একটি ফটোগ্রাফি কোর্স।

এলিট উইনার পেয়েছেন ৫০ হাজার টাকা, একটি অপো স্মার্টফোন ও একটি পাঠশালা ফটোগ্রাফি কোর্স। মাস্টার উইনার পেয়েছেন ৩০ হাজার টাকা, একটি অপো স্মার্টফোন ও একটি পাঠশালা ফটোগ্রাফি কোর্স। প্রতিটি বিভাগের বিজয়ীদের জন্য ছিল ২০ হাজার টাকা, একটি অপো স্মার্টফোন ও একটি পাঠশালা ফটোগ্রাফি কোর্স।

স্মার্টফোন থেকে ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং
পাঠশালার সঙ্গে যৌথ এই উদ্যোগে স্মার্টফোন প্রযুক্তি, পেশাদার ফটোগ্রাফি দক্ষতা ও সৃজনশীল অভিব্যক্তিকে এক জায়গায় আনা হয়েছে। ফলে ‘অপো ফটোগ্রাফি কনটেস্ট ২০২৬’ শুধু একটি ছবি প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তরুণদের নিজেদের চোখে দেখা পৃথিবীকে গল্পের ভাষায় তুলে ধরার একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে।

একটি স্মার্টফোন ক্যামেরা হাতে নিয়ে তাই এখন শুধু সুন্দর ছবি তোলাই লক্ষ্য নয়। চারপাশের পরিচিত পৃথিবীর মধ্যে নিজের দেখা নতুন গল্পটি খুঁজে বের করাই হয়ে উঠছে ফটোগ্রাফির আসল চ্যালেঞ্জ।

image

আপনার মতামত দিন