কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে চীন। তবে এ খাতে বৈশ্বিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতার মধ্যেই দেশটির শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। গত মে মাস থেকে চীনের শেয়ারবাজারের বাজারমূল্য কমেছে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার। এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ, দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর নতুন নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রযুক্তি শেয়ারের দরপতনে ক্ষতিগ্রস্ত পুরো বাজার
ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের পর থেকে চীনের শেয়ারবাজার থেকে ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য মুছে গেছে। সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার নিয়ে গঠিত স্টার ৫০ সূচক গত জুন থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে বড় কোম্পানিগুলোর অন্যান্য সূচকও প্রায় ২০ শতাংশ পতনের মুখে পড়েছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব অনুযায়ী, চীন ও হংকংয়ের শেয়ারবাজারের মোট বাজারমূল্যের ৪০ শতাংশের বেশি আসে এআই-সংশ্লিষ্ট শেয়ার থেকে। ফলে এ খাতের শেয়ারের দর কমলে তার প্রভাব পুরো বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে।
বিপুল বিনিয়োগেও মুনাফা নিয়ে অনিশ্চয়তা
এআই খাতকে এগিয়ে নিতে চীন সরকার বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করছে। এর অংশ হিসেবে রাষ্ট্রসমর্থিত ৬ হাজার কোটি ইউয়ানের একটি এআই বিনিয়োগ তহবিল চলতি মাসে দেশীয় প্রযুক্তি উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্থায়ন শুরু করেছে। তবে প্রযুক্তিপণ্যসহ বিভিন্ন খাতে চীনা ভোক্তাদের ব্যয় করার প্রবণতা দুর্বল থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত বিক্রি করতে পারছে না। এতে মুনাফা অর্জনেও সমস্যা হচ্ছে। ফলে সরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই করা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের চীনবিষয়ক পরিচালক ড্যান ওয়াংয়ের মতে, চলতি বছর প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার হার প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বৃদ্ধি এবং চীনের অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতা প্রযুক্তি খাতের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ভোক্তাদের ব্যয় কম থাকলে রাষ্ট্রনির্ভর বিনিয়োগ মডেল কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তি খাতে বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি পণ্য ও সেবার বাস্তব চাহিদা এবং লাভজনক ব্যবসায়িক মডেল নিশ্চিত করা এখন চীনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় বাড়ছে উদ্বেগ
পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিপণ্যসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কাও চীনের শেয়ারবাজারে চাপ বাড়াচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র চীনে তৈরি হিউম্যানয়েড রোবট নিষিদ্ধ করেছে। এ ছাড়া ডেটা সেন্টারে চীনা যন্ত্রাংশ ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চীন রপ্তানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিধিনিষেধ বাড়লে দেশটির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্য বিক্রি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অভ্যন্তরীণ চাহিদাও দুর্বল থাকায় বিকল্প বাজার খুঁজে পাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
হিউম্যানয়েড রোবটেও মিলছে না প্রত্যাশিত সাড়া
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে চীন রোবট প্রযুক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ‘এমবডিড এআই’ নামে পরিচিত এ প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বাস্তব জগতের বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সংকুচিত হওয়ার মতো জনমিতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও রোবটকে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখছে বেইজিং। তবে এ খাতের চাহিদা মূলত সরকারি সংস্থা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক। সাধারণ ভোক্তাদের কাছে হিউম্যানয়েড রোবট ও রোবট কুকুরের মতো পণ্য এখনো বেশ ব্যয়বহুল। পাশাপাশি বাড়িতে ব্যবহার করার মতো কার্যকারিতাও এসব পণ্যের সীমিত।
রোবট প্রযুক্তির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন
বিনোদন ও প্রদর্শনীতে জনপ্রিয়তা পেলেও দৈনন্দিন জীবনে হিউম্যানয়েড রোবটের ব্যবহার এখনো ব্যাপক হয়নি। চীনের শীর্ষস্থানীয় রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রির শেয়ারের দাম আগস্টে লেনদেন শুরুর পর থেকে অর্ধেকে নেমে এসেছে।
ড্যান ওয়াংয়ের মতে, এমবডিড এআই প্রযুক্তি এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যেখানে তা বৃহৎ ভোক্তাবাজারে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হতে পারে। কম মুনাফা, যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বৃদ্ধি এবং চীনের দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা-সব মিলিয়ে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে।
বিনিয়োগে উৎসাহ দিয়েও গতি ফেরাতে পারছে না বেইজিং
চীনা সরকার দেশীয় বিনিয়োগকারীদের অর্থ দেশের ভেতরেই বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে চায়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিদেশে বিনিয়োগের ওপর বিধিনিষেধও কঠোর করেছে বেইজিং। আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে আরও কিছু বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার কথা। তবে এসব পদক্ষেপ চীনের শেয়ারবাজারে নতুন বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়াতে পারেনি। অবশ্য প্রযুক্তি খাতের সব অংশে হতাশা তৈরি হয়নি।
ড্যান ওয়াংয়ের মতে, এআই গবেষণা ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মতো খাতে এখনো আশাবাদ রয়েছে। বিশেষ করে সামরিক খাতের সঙ্গে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সম্পর্ক থাকায় এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সহায়তা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এআই খাতে বৈশ্বিক বিনিয়োগের উন্মাদনা, আইপিওতে এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্বজুড়ে এআই নিয়ে বিনিয়োগের উন্মাদনা অন্তত আরও এক বছর স্থায়ী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক, যারা ক্লড নামের চ্যাটবট তৈরি করেছে, সোমবার শেয়ারবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য আইপিও থেকে ১০ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত সংগ্রহ হতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এটি শেয়ারবাজারের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ আইপিও হতে পারে। বিপরীতে, চীনে এ মুহূর্তে এ ধরনের বড় কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আইপিওর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এতে এআই খাতে বিনিয়োগের সুযোগ ও বাজারের প্রত্যাশার ক্ষেত্রে দুই দেশের পার্থক্য স্পষ্ট হচ্ছে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় বড় প্রণোদনা নিয়ে সতর্ক চীন
অর্থনীতিতে প্রণোদনা দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য চীনের নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ রয়েছে। তবে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সময়ে বড় ধরনের নতুন প্রণোদনা ঘোষণার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতারা এ সপ্তাহে পঞ্চম প্লেনামে বৈঠক করছেন। আগামী বছরের ২১তম পার্টি কংগ্রেসের প্রস্তুতির ভিত্তি তৈরি করাও এ বৈঠকের অন্যতম উদ্দেশ্য। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে-এমন ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয় বেইজিং।
ড্যান ওয়াংয়ের ভাষায়, যেকোনো প্রণোদনা কর্মসূচিই উচ্চ ঝুঁকির; উদ্যোগ ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারককে দায় নিতে হতে পারে। সব মিলিয়ে, এআই ও প্রযুক্তিতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার উচ্চাভিলাষকে বাস্তব চাহিদা ও টেকসই মুনাফার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করাই চীনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও ভোক্তাদের ব্যয় ও বেসরকারি খাতের আয় না বাড়লে প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজারের উত্থান ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। সূত্র: ব্লুমবার্গ, দ্য গার্ডিয়ান