ফ্রিল্যান্সিংয়েই ৭০ লাখ আয় করেছেন আব্দুল্লাহ আল ইমন

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২০
https://mail.techvoice24.com/assets/images/logoIcon/logo.png উজ্জ্বল এ গমেজ
https://mail.techvoice24.com/assets/images/logoIcon/logo.png
  ছবি: সংগৃহীত
রাত জেগে মোবাইলে ফেসবুকিং বা ইন্টারনেটে ঘাটাঘাটি করলে বাবা-মা ভাবতেন, ছেলেটা বুঝি উচ্ছন্নে যাচ্ছে। ওর আর পড়ালেখা হবে না। ফেসবুক বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে রোজগার করা যায়, এই সম্পর্কে তাদের কোন ধারণাই ছিল না। পড়ালেখার পাশাপাশি নিজের আন্তরিক চেষ্টা ও অদম্য ইচ্ছায় ফ্রিল্যান্সিং করছেন তিনি। শুধু ফ্রিল্যান্সিং করেই আয় করেছেন ৭০ লাখ টাকার বেশি। মধ্যবিত্ত পরিবারে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের একমাত্র ভরসা জায়গা হয়ে উঠেছেন। হয়ে উঠেছেন ছোটদের অভিভাবক।

বলছি ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘ইনোভা’র প্রতিষ্ঠাতা এবং সফল ফ্রিল্যান্সার আব্দুল্লাহ আল ইমনের কথা। বর্তমানে তিনি মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সে সাথে সিলেট সদরে শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং ইনকিউবেশন সেন্টারের মেন্টরের দায়িত্ব পালন করছেন। একইসঙ্গে ফ্রিল্যান্সিং করছেন। ইমনের এই সফলতা এক দিনে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে অনেক শ্রমের গল্প, ঘামের ইতিহাস।

সিলেটের শিবগঞ্জের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম আব্দুল্লাহ আল ইমনের। বাবা নুরুল ইসলাম ছিলেন ব্যবসায়ী। মা ফাতেমা ইসলাম গৃহিণী। এক বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে ইমন দ্বিতীয়। বড় বোন বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট দুই ভাই পড়ালেখা করছেন।

ইমনের বাবার দুইটা ট্রাক ছিল। সেগুলি ভাড়ায় খাটতো। সেখান থেকে যা আয় হতো তা দিয়েই চলতো তাদের পরিবার। ইমন বলেন, বাবার ট্রাক ব্যবসা মোটামুটি ভালোই চলছিল। ২০০৫ সালে ব্যবসায় অনেক বড় ক্ষতি হয়। তখন থেকে বাবার একার পক্ষে সংসার চালাতে কষ্ট হত। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে সংসারের দায়িত্ব আসে আমার উপর। তাই আমি হাইস্কুল থেকেই পড়ালেখার পাশাপাশি টিউশনি করি। এতে নিজের যাবতীয় খরচ চালানোর পাশাপাশি ভাইদেরও দিতাম।

এসএসসি পাস করার পর হাতে অফুরন্ত সময়। তখন নতুন কিছু করার পরিকল্পনা করেন ইমন। ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটারের প্রতি আলাদা ঝোঁক ছিল। শেখার নেশায় ভর্তি হন কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারে। কম্পিউটার শেখার পাশাপাশি অনলাইনে ঘাটাঘাটি করে জানতে পারেন- এখান থেকে টাকা আয় করা যায়।

ইমনের ভাষ্য, তখন টিউশনি করে যে টাকা আয় করি, পাশাপশি যদি ফ্রিল্যান্সিং করি, তাহলে আরো ভালো চলতে পারব। এই ভাবনা থেকে সিদ্ধান্ত নেই ফ্রিল্যান্সিং করার। খুঁজতে শুরু করি, কোথায় প্রশিক্ষণ নেয়া যায়। হঠাৎ জানতে পারি ফ্রিল্যান্সার কাউসার আহমেদ চৌধুরী নতুন ফ্রিল্যান্সারদের জন্য দিনব্যাপী ফ্রিল্যান্সিং সেমিনারের আয়োজন করছে। সেখানে যোগ দেই। সেমিনারে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা লাভ করি। তার ভাষায় কেউ চেষ্টা করলে ফ্রিল্যান্সিং তেমন কোনো কঠিন বিষয় না। শুধু ভালো মতো শিখতে হবে। নিজেকে তৈরি করতে হবে।

২০১২ সালের কথা। কলেজে ভর্তি হন ইমন। তখন ফ্রিল্যান্সিং শেখার জন্য ভালো, যোগ্য প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পাওয়া কঠিন ছিল। তখন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও এখনকার মতো এতো বেশি সহজলভ্য ছিল না।

ইমন বলেন, সেই সময় মোবাইল ডাটা কিনে মডেমের সাহায্যে কাজ করতে হতো। টিউশনির টাকায় অনেক কষ্টে ছোট একটা ল্যাপটপ কিনি। দিনে পড়ালেখা, টিউশনি সব সামলে রাত জেগে গুগল ও ইউটিউবের সাহায্যে নিয়মিত ফ্রিল্যান্সিং শেখার চেষ্টা চালিয়ে যাই। শুরুতে ইউটিউব ছিল আমার মেন্টর। বিভিন্ন টিউটোরিয়াল দেখে গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ শেখা শুরু করি। এভাবে কেটে যায় তিন বছর।

২০১৫ সাল। এডুকেশন পার্ক আইটি ট্রেনিং সেন্টারে ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন ইমন। ওই সেন্টারে স্টুডেন্টদের জন্য যত গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ ছিল সব কাজ করতেন তিনি। নিয়মিত কাজ করতে করতে গ্রাফিক ডিজাইনের অনেক কাজ শেখা হয়ে যায়। নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

ইমন বলেন, দুই বছরে গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ ভালোভাবে শিখলেও কিভাবে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজ শুরু করব সেটা জানা ছিল না। এ বিষয়ে ইন্টারনেটে জানার চেষ্টা করতে থাকি। ট্রেনিং সেন্টারের চাকরিটা ছেড়ে দেই। মার্কেটপ্লেসে ঢোকার চেষ্টা করি।

২০১৭ সাল। ইমন এক বন্ধুর কাছে জানতে পারেন সিলেটে সরকারের লানিং অ্যান্ড আনিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টে (এলইডিপি) অধীনে পরিচালিত প্রফেশনাল আউসোসিং ট্রেনিং কোর্সে জন্য শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। কোনো আগপিছ চিন্তা না করেই তাতে আবেদন করেন। শুরু হয় ফ্রিল্যান্সিংয়ে নতুন যাত্রা।

ইমনের ভাষ্য, আমি তো গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ আগে থেকেই শিখেছি। ওখানে ভর্তি হয়েছি- কীভাবে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে ঢোকা যায়, কোন কোন মার্কেটপ্লেসে ফ্রিল্যান্সিং কাজ করা যায়, কৌশল জানার জন্য। এখান থেকেও গ্রাফিক ডিজাইনের আরো অনেক নতুন কিছু জেনেছি। আর ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে বিস্তারিতভাবে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছি।

লানিং অ্যান্ড আনিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টে হাতে-কলমে ফ্রিল্যান্সিং শেখার সময় ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপের সাথে যুক্ত হন ইমন। ২০১৭ সালের শেষের দিক। প্রশিক্ষণ শেষে একটা ফেসবুক গ্রুপে গ্রাফিক ডিজাইনের কাজের পোস্ট দেখেন তিনি।

ইমন বলেন, একদিন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়ার সময় ফেসবুকিং করছিলাম। তখন দেখি একটা দেশীয় কোম্পানির গ্রাফিক ডিজাইনের কাজের পোস্ট। ওই কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করি। আমার কাজ দেখতে চান। তারা আমার কাজ পছন্দ করে আমাকে অফার দেন। কাজটা তিন দিনে করে দেই। ১৫ হাজার টাকা পাই। যেখানে আইটি প্রতিষ্ঠানে মাস শেষে ৫ হাজার টাকা পেতাম, সেখানে তিনদিনে কাজ করে ১৫ হাজার টাকা।

তিন মাসের বেতনের টাকা তিনদিনে রোজকার করে ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রতি আগ্রহটা বেড়ে যায় বহুগুণ। অনলাইনে কাজ করে টাকা পাওয়া নিয়ে যে অনিশ্চিয়তা ছিল, সেটা দূর হয়ে যায়। নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসটাও বেড়ে যায় তার। ঠিক তখনই পরিবার দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে।

এ বিষয়ে ইমন বলেন, গ্রাজুয়েশন ফাইনালের আগে পরিবার থেকে ইটালি যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে। দেশের বাইরে গেলে বেশি টাকা আয়ের সুযোগ আছে। আমার বিশ্বাস ছিল দেশে থেকেই অনলাইনে কাজ করে বিদেশের থেকে বেশি টাকা আয় করতে পারব। তাই বিদেশে যাইনি।

২০১৮ সালে আইটেক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে গ্রাফিক ডিজাইনার ট্রেইনার হিসেবে যোগ দেন ইমন। ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিংও সমানতালে চলতে থাকে। অনলাইন মার্কেটপ্লেস ফাইবারডটকমে নিয়মিত কাজ করতে থাকেন। কাজের অভিজ্ঞতা বাড়লে নিজে কিছু করার প্রত্যয়ে আরও দুই বন্ধুকে সাথে নিয়ে শুরু করেম ফিউচার আইটি ভ্যালি নামের ফ্রিল্যান্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের। বন্ধুরা হলেন ফকরুল আবেদীন রাহাত ও মিসবাহউর রহমান। শুরুতেই প্রচুর সাড়া পান তারা। ভাগ্য প্রসন্ন হতে শুরু করে।

ইমন তখন পুরোদস্তুর ফ্রিল্যান্সার ও প্রশিক্ষক। এরই মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে রাবেয়ান আইটি থেকে মাসিক চুক্তিতে চাকরির অফার পান তিনি। সেটা শুরু করেন। কিছু দিন কাজ করার পর আরেকটা ক্লায়েন্ট তাকে কাজের অফার দেন।

ইমন বলেন, সেন্টারে ট্রেনিংয়ের পাশাপশি মার্কেটপ্লেসে কাজ করছিলাম। অন্যদিকে রাবেয়ান আইটির জব। আবার অন্য আরেকজন ক্লায়েন্ট আমার কাজে খুশি হয়ে মাসিক চুক্তিতে নেন। দেশে এক বন্ধু তার নেক্সাস প্রমো আইটি অ্যাজেন্সিতে বিভিন্ন গ্রাফিক ডিজাইনের কাজগুলোও আমাকে করতে দিত। তখন এক সাথে তিন-চারটা কোম্পানিতে দিন-রাত এক করে কাজ করেছি।

ফিউচার আইটি ভ্যালিতে পার্টনারশিপে দুই বছর কাজ করার পর ব্যবসা বন্ধ করে দেন ইমন। ২০১৯ সালে একাই শুরু করেন ফ্রিল্যান্সিং প্রতিষ্ঠান ‘ইনোভা’ আইটি অ্যাজেন্সি। উদ্দেশ্য মার্কেটপ্লেস থেকে কাজ এনে স্থানীয় ফ্রিল্যান্সারদের দিয়ে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কাজ করানো। তারপর ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে ইমনের ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয়ের দৃশ্যপট। একদিকে বিদেশি কোম্পানির কাজ অন্যদিকে দেশীয় আইটি কোম্পানি ও প্রজেক্টের কাজ। সবমিলে আয়ের পরিমাণটা দিন দিন বাড়তে থাকে।

২০১৯ সালে আইসিটি ইকো সিস্টেমে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং এ সেক্টরে উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে নারীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ‘প্রযুক্তির সহায়তায় নারীর ক্ষমতায়ন’শিরোনামে ‘শি পাওয়ার’ প্রকল্পে ৬ মাস ট্রেইনার হিসেবে কাজ করেছেন ইমন। এরপর ২০২০ সালে করোনা মাহামারির সময়ে পটুয়াখালি জেলার অধীনে সরকারের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণ প্রজেক্টেও ট্রেইনার হিসেবে কাজ করেছেন। তখন অনলাইনে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সিলেট শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং ইনকিউবেশন সেন্টারের গ্রাফিক ডিজাইনার মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে মাসে যে ছেলে বাবার হাতে ৫ হাজার টাকা এনে দিতেন, ফ্রিল্যান্সিং করে ওই ছেলে যখন এর চেয়ে ছয়-সাতগুন বেশি টাকা দিতে শুরু করেন, তখন বাবা পড়ে যান দুশ্চিন্তায়। ছেলে এত টাকা আয় করে কীভাবে? তাহলে ছেলে কী অবৈধ উপার্জন করছে? অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজের শুরুর আয়ের অভিজ্ঞতার কথা এভাবেই জানান ইমন।

ইমন আজ পরিবারের একমাত্র উপর্জনক্ষম ব্যক্তি। আত্মপ্রত্যয়ী এই ফ্রিল্যান্সার বলেন, একটা ল্যাপটপ আর ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঘরে বসে যে বিদেশ থেকে আয় করা যায় সেটা আমাদের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষ বিশ্বাস করেছে। এখন কোন অসুবিধা হয় না।

ইমনের সফলতার পেছনে সবার আগে রয়েছেন তার বাবা-মা। তারা শুরুতে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়টা বুঝতে না পারলেও বোঝার পর সব ধরনের সাপোর্ট দিয়েছেন তারা। এরপরে রয়েছেন তার শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধুরা, শ্রদ্ধেয় ট্রেইনারগণ এবং মেনটর মো. ইকরাম স্যার। সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি।

মার্কেটপ্লেসে যারা কাজ করতে আগ্রহীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, যেকোনো একটা বিষয়ে দক্ষ হতে হবে। একসাথে বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করা যাবে না। নিজের কাজকে ভালোবাসতে হবে। কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ী হয়ে লেগে থাকতে হবে। মার্কেটপ্লেসে কাজ করার আগে নিয়ম জানা থাকতে হবে।

জীবনের অর্জন বিষয়ে তার ভাষ্য, ফ্রিল্যান্সার বলেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক স্যারের সাথে দেখা করার সুযোগ হয়েছে। উনি অনেক উৎসাহমূলক কথা বলেছেন। সরকারিভাবে বিভিন্ন প্রোগ্রামে গিয়েছি। সবার কাছ থেকে সম্মান আদর ও ভালোবাসা পেয়েছি। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে শুরু থেকে প্রায় ৭০ লাখের বেশি টাকা আয় করেছি। সকলের দোয়ায় অনেক ভাল আছি। এর থেকে বড় অর্জন আর কী বলেন?

ফ্রিল্যান্সিংকেই ফুলটাইম পেশা হিসেবে নিতে চান ইমন। পাশাপাশি ইনোভা আইটি অ্যাজেন্সিকে দেশের অন্যতম সেরা আইটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার। সিলেটে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছে। এসব তরুণদের কর্মসংস্থান করে সিলেটের বেকারত্ব হার কমাতে চান অদম্য এই ফ্রিল্যান্সার।

image

আপনার মতামত দিন